রবিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১, ০৯:৪৮ অপরাহ্ন

হাম হাম ঝর্নায় স্মৃতিময় এক দিন

ইকবাল হোসেন তালুকদার
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০
  • ৯০ বার পঠিত

পাহাড় অরণ্য ঘেরা মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকদের দৃষ্টিনন্দন স্থানের মধ্যে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টের কুরমা বনবিট অন্যতম।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে কুরমা বন বিট এলাকায় অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক জলপ্রপাত বা ঝরণা হল হামহাম বা চিতা ঝর্ণা।পানির তীব্র শব্দ, আর ঝরণা সেরকমই শব্দ করে।কমলগঞ্জের একেবারে শেষ গ্রামের নাম কলাবনপাড়া, যেটি তৈলংবাড়ি নামেও পরিচিত।

বলতে গেলে এরপর থেকেই আর তেমন কোনো জনবসতি নেই। আর এখান থেকেই শুরু হয় হামহাম যাওয়ার আসল অ্যাডভেঞ্চার।ঝরণার যৌবন হলো বর্ষাকাল। বর্ষাকালে প্রচন্ড ব্যাপ্তিতে জলধারা গড়িয়ে পড়ে। ঝরণার ঝরে পড়া পানি জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ছড়া তৈরি করে বয়ে চলেছে। এরকমই বিভিন্ন ছোট-বড় ছড়া পেরিয়ে জঙ্গলের পথ পেরিয়ে এই ঝরণার কাছে পৌঁছতে হয়।

কিভাবে গিয়েছিলাম
যখন গাড়ি থেকে নামলাম তখন সেখানে দেখি কিছু ছেলে/মেয়ে দাড়িয়ে আছে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় যাবেন তখন তারা বলতেছে হাম হাম যাব তখন আমি বলে উঠলাম খুব ভালো আসতেছি তোমরা জাও। তারপর দেখি সেখান কার অধিবাসী অনেক বাচ্চা লাঠি নিয়া আসতেছে দুর দিয়ে তখন ভয় ভয় লাগতেছে এখন কি কিছু করবে বাচ্চা গুলা এসে বলতেছে লাঠি নেন ৫ টাকা আমার ভয়টা ভাঙ্গল তখন দেখি ৬/৮ টি বাচ্চা আমার চার পাশে আমাকে বলছে, আমার কাছ থেকে লাঠি নেন, ভ্রমণের সময় পাহাড়ি পথে হাটার সুবিধার্থে এবং আত্মরক্ষার্থে সাথে একটি বাঁশ নিয়েছিলাম।সবাই কে বললাম জাওয়ার সময় সবাই কে চকলেট খাওয়ার টাকা দিয়ে জাব এখন জাও তোমরা।স্থানীয় এক জন লোক এসে বলতেছে আমি নিয়ে যাব আমার সাথে জাইতে পারেন তখন বললাম চলেন তখন বাবলাম যেহেতু আমাকে নিয়া জাবে ৭ কিলোঃ দুরে তখন জিজ্ঞেস করলাম আপনাকে কত টাকা দিতে হবে সে বলতেছে ৭শ টাকা আমি বললাম ৩শ টাকা দিমু আমি ছাত্র মানুষ সে বলছে আরেকটু বাড়িয়ে দিয়েন বলে শুরু হল হাটা।চম্পারায় চা-বাগান থেকে ঝরণার দূরত্ব প্রায় ৬/৮ কিলোমিটার। শুরুতে ওই সেখানের দায়িত্বে ফরেস্ট অফিসার ডাক দিয়ে বলতেছে কোথায় জাইতেছেন আমি বললাম আপনাদের এখান কার দায়িত্বে যিনি ওনার কাছ থেকে পারমিশন নেওয়া হয়েছে পারমিশন নিয়েছেন কমলগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সদস্য আমার প্রিয় ভাই। তখন সেই অফিসার বলতেছে মনে হয়েছে আমাকে স্যার বলছিলেন গত ৪ দিন আগে আপনারা দে আসবেন ঠিক আছে জাইতে পারেন। আবার শুরু করলাম হাটা পথে অত্যন্ত খাড়া মোকাম টিলা পাড়ি দিতে এবং অনেক ঝিরিপথ ও ছড়ার কাদামাটি দিয়ে পথ চলতে তাকলাম।

ঝিরিপথে কদাচিৎ চোরাবালুও এছাড়া গভীর জঙ্গলে বানর, সাপ, মশা এবং জোঁকের অত্যাচার সহ্য করে পথ চলতে তাকলাম।প্রায় ২০ মিনিট হাটার পর ভয় লাগছে এবং এত উচু পাহাড় দেখে ভয় লাগার কথা তখন হাটতে তাকলাম আর পায়ে শুরু হল ব্যাথা।বনের শুরুতেই হাতের ডানে কারন ডানের পথটা দীর্ঘ এবং অনেক গুলো উঁচু টিলা ডিংগাতে হয়েছে। হাম হামে যাবার কিছু আগে পথে দেখতে পাই আরেকটি অনুচ্চ ছোট ঝরণার।

হাম হামের রয়েছে দুটো ধাপ, সর্বোচ্চ ধাপটি থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে মাঝখানের ধাপে, এবং সেখান থেকে আবার পানি পড়ছে নিচের অগভীর খাদে। জান যায়,ঝরণার নিকটবর্তি বাসিন্দারা আদিবাসী ত্রিপুরা।পথের দু পাশের বুনো গাছের সাজসজ্জা যেকোনো পর্যটকের দৃষ্টি ফেরাতে সক্ষম। জারুল, চিকরাশি ও কদম গাছের ফাঁকে ফাঁকে রঙিন ডানা মেলে দেয় হাজারো প্রজাপতি। ডুমুর গাছের শাখায় চারদিকে গাছগাছালি ও প্রাকৃতিক বাঁশবনে ভরপুর এ বনাঞ্চল। মিটিংগা, কালি,ডলু, মুলি, ইত্যাদি অদ্ভুত নামের বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ এ বাগানগুলোকে দিয়েছে ভিন্ন এক রূপ।

পাথুরে পাহাড়ের ঝিরি পথে হেঁটে যেতে যেতে সুমধুর পাখির কলরব মনকে ভাললাগার অনুভূতিতে ভরিয়ে দিয়েছে।দূর থেকে কানে ভেসে আসবে বিপন্ন বন মানুষের ডাক। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর শুরুতে দু’চোখের সামনে ভেসে উঠছে পাহাড় থেকে ধোঁয়ার মতো ঘন কুয়াশা ভেসে উঠার অপূর্ব দৃশ্য।মনে হয়েছে যেন ওই নয়নাভিরাম পাহাড় আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এভাবেই হাটতে হাটতে একসময় পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত হামহাম জলপ্রপাতের খুব কাছাকাছি। কিছুদূর এগুলেই শুনতে পেলাম হামহাম জলপ্রপাতের শব্দ।চলে গেলাম হাম হাম ঝর্নার কাছে তখন চারিদিকে এক শিতল শান্ত পরিবেশ। ডানে বামে কোনোদিক থেকেই চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না। মনে হয়েছে অনন্তকাল দুচোখ ভরে দেখে নেই প্রকৃতির এই অপূর্ব সৃষ্টি। এই অদ্ভুত এক রোমাঞ্চকর পরিবেশে আমি ভুলে গেছি আমি কোথায় আছি, চারদিকে গহীন জঙ্গল, উপরে আকাশ, পায়ের নিচে বয়ে যাওয়া ঝির ঝির স্বচ্ছ পানির ধারা আর সামনে বহমান অপরূপ ঝর্না।আয়নার মতো স্বচ্ছ পানি পাহাড়ের শরীর বেঁয়ে আছড়ে পড়ছে বড় বড় পাথরের গায়ে।চারপাশ গাছ গাছালি আর নাম না জানা হাজারো প্রজাতির লতাগুল্মে আচ্ছাদিত হয়ে আছে পাহাড়ি শরীর। স্রোতধারা সে লতাগুল্মকে ভেদ করে গড়িয়ে পড়ছে ভুমিতে। স্মৃতিময় হয়ে তাকবে এই দিন।

লেখক : সাংবাদিক

আরও

ফেসবুক পেজ

© sbarta24.com সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD
jphostbd-2281
x