বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১, ০৭:০৮ পূর্বাহ্ন

সিলেটে ‘খাঁচাবন্দি’ শিশু, ইন্টারনেটে আসক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৭ মার্চ, ২০২১
  • ৫২ বার পঠিত
য়ালের মধ্যে বন্দি শিশু-কিশোর। খাঁচাবন্দি এসব শিশু-কিশোরদের বিবর্ণ শৈশব এভাবেই কেটে যাচ্ছে। তাদের জন্য নেই কোনো খেলার মাঠ ও পার্ক। এমন পরিবেশেই বেড়ে উঠছে সিলেট মহানগরীর শিশু-কিশোররা। বয়স্কদেরও একই দশা। ইট-পাথরের আবদ্ধ এই শহরে তাদেরও হাঁটার কোনো খোলা জায়গা নেই।
বিষয়টি নিয়ে শঙ্কিত অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এমন পরিবেশের কারণে শিশুরা শরীর ও মনে অপরিপূর্ণতা নিয়ে বেড়ে উঠছে। যার ফলে শ্রদ্ধা, সহনশীলতা, বিনয় এসব মানবিক বিষয়ে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। আর সিলেট সিটি করপোরেশন বলছে, শিশুদের জন্য খেলার মাঠ কিংবা পার্ক তৌরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও নগরে সিংহভাগই ব্যাক্তিমালিকনাধীন জায়গা থকায় তারা কার্যত কোন পদক্ষেপ নিতে পারছেন না।
তবে আশার কথা হলো, ইতোমধ্যে নগরের অদূরে দক্ষিণ সুরমা, দলদলি একালা ও নগরীর উপকন্ঠ টিলাগড়ে খেলার মাঠের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে। জায়গা পেলেই খেলার মাঠ ও পার্ক তৌরীর পক্রিয়া শুরু করা হবে। তাছাড়া বয়স্কদের হাঁটার জন্য সুরমা নদীর পাড় ও বিভিন্ন ছড়ার উপর দিয়ে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে তৌরীর কাজও চলছে। এছাড়া নগরের আলমপুরে শেখ হাসিনা শিশু পার্কের কাজও শেষ পর্যায়ে শিগগিরই সেটা শিশুদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
এদিকে শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায় শিশু-কিশোররা ইন্টারনেটের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। এতে একদিকে যেমন শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তারা ইন্টারনেট ভিত্তিক গেমস, ছেসবুক ইউটিউবে আকৃষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে তারা ইন্টারনেট ভিত্তিক গেমসে ঝুঁকে পড়ছে, যা শিশু-কিশোরদের বিপথগামী করছে। এর ফলে ধীরে ধীরে কিশোররা মাদক থেকে শুরু করে খুনোখুনিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
নগরের সুবিদবাজার এলাকার একটি বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা মাসুম আহমদের স্কুল পড়ূয়া এক ছেলে ও মেয়ে রয়েছে। তিনি জানান, তার কেজি ওয়ানে পড়ুয়া ছেলে মানহার ‘সারাদিন ইন্টারনেট গেমস কিংবা টেলিভিশন নিয়ে বসে থাকে। এই বয়সে সে চশমা ব্যবহার করে। ডাক্তার বলেছে মোবাইল ফোনের আলোয় তার চোখে প্রভাব পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সিলেট শহরের আশেপাশে ওসমানী শিশু পার্ক ছাড়া আর কোনো বিনোদন পার্ক নেই। সেটির পরিবেশও নোংরা, শিশুরা যেতে চায় না। আর ড্রীমল্যান্ড পার্ক শহর থেকে অনেক দূরে। চাইলেই বাচ্চাদের নিয়ে সেখানে যাওয়া সব সময় সম্ভব হয়না।’
মদিনা মার্কেট এলাকার বিদ্যানিকেতন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাবিতুল ইসলাম। ‘স্কুল থেকে ফিরেই সরাদিন মোবাইল ফোন কিংবা টেলিভিশন নিয়ে বসে থাকে। গেমস, ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি দেখে।’
তারা মা পলি বেগম বলেন, ‘দুই রুমের ভাড়া একটা বাসায় থাকি। বাচ্চারা যে একটু খেলাধুলা করবে সেজন্য খোলা জায়গা কিংবা আশেপাশে কোথাও মাঠ নেই। বাচ্চারা বাসার ছাদে খেলাধুলা করতে চায়।’ ভয়ে থাকি কখন যানি দূর্ঘটনা ঘটে। সেজন্য ছাদে খেলতে বারণ করি। এজন্য সে সারাদিন ইন্টারনেট গেমস, ইউটিউব নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এতে করে সে সহিংসতা শিখছে। পড়ালেখায়ও অমনোযোগী হয়ে ওঠছে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে জানা যায়, সিলেট মহানগরীতে ৪৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রায় অর্ধশতাধিক বিদ্যালয় এবং শতাধিক কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি সরকারি স্কুলে ছোট খেলার মাঠ থাকলেও বেশিরভাগেরই মাঠ নেই। তাছাড়া বেসরকারি স্কুল, কিন্ডারগার্টেন কিংবা ইংশিল মিডিয়াম স্কুলগুলোর অধিকাংশেরই খেলার মাঠ নেই।
এসব স্কুলের বার্ষিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় অন্য মাঠে কিংবা ভাড়াটে অডিটরিয়ামে। অথচ স্কুল অনুমোদন নীতিমালার ভেতরে খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক হলেও সিলেট মহানগরীর বেশিরভাগ স্কুলেই খেলার মাঠ নেই। যে কয়টি স্কুলে খেলার মাঠ রয়েছে সেগুলোও অপরিচ্ছন্ন-নোংরা পরিবেশ।
সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রুহুল আলম বলেন, ‘নগরে বেশিরভাগই ব্যাক্তিমালিকনাধীন জায়গা। কেউ জায়গা দিতে চায়না। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্বেও খেলার মাঠ বা পাক নিমার্ণে কার্যত কোন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। তবে ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকার ভিবিন্ন ওয়ার্ডে খালি কিংবা খোলা জায়গা খোঁজা হচ্ছে। কেউ যদি জায়গা বিক্রি করতে চায় প্রয়োজনে সেটি কিনে হলেও মাঠ তৌরি করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় বলেন, পুরাতন কয়েকটি স্কুল ছাড়া আর কোনো স্কুলেই খেলার মাঠ নেই। এমনকি বাসাবাড়িতে খেলার জন্য জায়গাও নেই। মানুষ এখন মৌমাছির চাকের মত বসবাস করছে। এতে করে মানসিক যে বিকাশের প্রয়োজন সেটি বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে।
বিশেষ করে শিশুদের মানসিক বিকাশে এর প্রভাব পড়ছে সবথেকে বেশি। এর পাশাপাশি রয়েছে পড়াশুনার প্রতিযোগিতা। এই দুই চাপ সামলাতে গিয়ে মানুষের মত মানুষ গড়ে উঠা এখন অলিখ ভাবনা ছাড়া আর কিছুই না।
আরও খবর
© sbarta24.com সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD
jphostbd-2281
x