1. admin@sbarta24.com : Rahat : Anwar Babul
গজব আর গুজব তত্ত্বে বেকায়দায় ‘নিরক্ষর মানুষ’ - Home
বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৪১ পূর্বাহ্ন
এই মুহূর্তে
Welcome To Our Website... করোনা মুক্তিতে দেশ ও জাতির জন্য ঈদ জামাতে বিশেষ দোয়া, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কালবৈশাখী ঝড়ের আভাস। টিকা নিয়ে নতুন ঘোষণা রাশিয়ার, এক ডোজই রুখে দেবে করোনার সব ভ্যারিয়েন্ট....

গজব আর গুজব তত্ত্বে বেকায়দায় ‘নিরক্ষর মানুষ’

আহমদ ইমরান
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২০
  • ৩৫৯ বার পঠিত

বর্তমান বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে করোনাভাইরাস। প্রাণঘাতী এই করোনাভাইরাসে প্রতিনিয়ত বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, পিছিয়ে নেই মৃত্যুর মিছিলও। এই করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ লকডাউন ঘোষণা করেছে। এতে গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ২০০ কোটি মানুষ। অন্যদিকে স্কুল কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রায় ৫০ কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন অনিশ্চয়তায় মধ্যে পড়ে আছে। একই সাথে অনিশ্চিত স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তাও। কবে বিশ্ব আবার স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসছে সেই নিশ্চয়তাও নেই। এমন অবস্থায় বাংলাদেশও রয়েছে। করোনার বিস্তার ঠেকাতে অঘোষিত লকডাইন করে রাখা হয়েছে পুরো দেশ। স্থবির হয়ে পড়েছে মানুষের জীবনযাপন।

এমন অবস্থাতেও সতর্ক নয় দেশের মানুষ। প্রতিনিয়তই দেশের এক শ্রেণির মানুষ করোনা ভাইরাসকে আল্লাহ’র গজব বলে বুলি আওড়াচ্ছেন। কিছু মানুষ আরো একধাপ এগিয়ে করোনার সম্পূর্ণ রূপকে তিনভাগে ভাগও করে ফেলেছেন। এরমধ্যে ক-তে কোরআন, রো-তে রোজা আর না-তে নামাজ। সেই হিসেবে মানুষ ধরেই নিয়েছে এটি মুসলমানদেরকে আক্রান্ত করবে না।

এতে তাদের বিশ্বাসমত যুক্তিও আছে, ১/ চীন মুসলিম উইঘুর সম্প্রদায়কে বছরের পর বছর ধরে নির্যাতন করছে, ২/ ইতালি কয়েকবছর আগে মুসলমানদের নির্যাতন করা হয়েছে, ৩/ ইরানে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিম বেশি ৪/ স্পেনে মুসলিমদের স্বাভাবিক অধিকার নেই, তারা মসজিদে আযান দিতে পারেন না। এমন সব যুক্তিতে এক শ্রেণির মানুষ বিশ্বাস করে করোনাভাইরাস শুধুই অমুসলিমদের আক্রমণ করবে। কোনভাবেই বাংলাদেশের মুসলমানদের করোনাভাইরাস আক্রমণ করবে না।


সুতরাং আমাদের দায়িত্ব হলো, সমাজে কোনো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তার প্রচার ও প্রসার থেকে বিরত থাকা। বাস্তবতা অনুসন্ধান করে নিজে সতর্ক হওয়া এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে তা অবগত করা। সর্বোপরি নিজের, পরিবারের, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে চেষ্টা করা আমাদের দায়িত্ব।


অথচ এই শ্রেণির লোক যুক্তিতে বুঝতে চায়না মিয়ানমারে দিনেরপর দিন মুসলিম রোহিঙ্গারা নির্যাতিত হচ্ছে। এরা বুঝতে চায় না সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করা ইসলামে নিষেধ আছে। এরা বুঝে না, সংকটকালীন সময় পণ্য মজুদ করতে ইসলামে নিষেধ করা আছে। নিষেধ করা আছে ঘুষ খাওয়া নিয়ে কিংবা অন্যর অনুপস্থিতিতে সমালোচনা করা নিয়েও। এরা যুক্তিতে বিশ্বাস করে না। এরা সব জায়গায় ধর্ম নিয়ে ব্যবসা শুরু করে। মাজার থেকে তাবিজ পর্যন্ত সব জায়গায় এরা ধর্মকে ব্যবসার পূঁজি ভাবে। আর তাদের এই ধর্ম ব্যবসার বড় ক্রেতাই হন সহজসরল মানুষ।

সরকার যেখানে করোনাভাইরাসে সংক্রমণ রোধে সচেতনতা কার্যক্রম নিয়েছে সেখানে আমরাও ‘গজব তত্ত্বে’ সচেতনতা এড়িয়ে চলছি। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশ যেখানে জনসমাগম এড়ানো জন্য মসজিদে আসা নিরুৎসাহিত করছে। এমনকি সৌদি সরকার পবিত্র কাবা শরীফ বন্ধ করে দিয়েছে। বন্ধ করেছে মসজিদে নামাজ আদায়ও। সেখানে আমরা গজব তত্ত্বে মাজার আর মসজিদে ভিড় করছি। কেউ কেউ করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে জনসমাগম করে দোয়া করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এক শ্রেণির লোক এটাকে রীতিমতো জিহাদের সাথে তুলনা করে মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ারও কথা বলছেন। এ নিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনন্দ কিংবা উৎসবও করছেন। অথচ ফজরের নামাজে বেশিরভাগ মসজিদেই এক কাতার মুসল্লি পাওয়া যায় না।

সবশেষ গতরাতে করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে ‘চিনি ছাড়া রং চা খাওয়ার’ তথ্য ছড়িয়ে দিলেন। একই সাথে সাক্ষ্য দিলেন একটি শিশুর জন্মের। যার জন্মই হয়েছে করোনার এই সামান্য রেসিপি বলার জন্য। কি নির্বোধ জাতি আমরা!

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দিবাগত রাতে ভাইরাল হওয়া এই তথ্য কিভাবে একদম গ্রামের মানুষের কাছে চলে গেল? আমরা কি একবারও ভেবেছি গুজবের পরিণতি কি হতে পারে? আমাদের কি মনে নেই ‘গুজব তত্ত্বে’ পিঠিয়ে মেরে ফেরা রেণুর কথা। মনে নেই ছেলেধরার গুজবে যে প্রাণগুলো গেল তাদের কথা। মনে নেই লবণকাণ্ডের কথা। এসব তো আমাদের মনে থাকার কথা।

কারণ গুজব মানেই ভিত্তিহীন কোনো কথার প্রচার। চাই তা মানুষ হাসানোর জন্য হোক বা মানুষের ভেতর ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য করা হোক। ইসলাম কোনো অবস্থায়ই গুজব ছড়ানোকে সমর্থন করে না। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষ সর্বতোভাবেই তা পরিহার করবে। বরং প্রয়োজন ব্যতীত কোনো কথা সে বলবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫০১)

অনেকের মধ্যে নিজের বিশ্বাস প্রচারের প্রবণতা দেখা যায়, যারা প্রচারিত কোনো সংবাদ নিজের মত, মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গির অনুকূলে হলে তা যাচাইয়ের প্রয়োজন বোধ করে না। পাওয়া মাত্রই প্রচার শুরু করে। ইসলাম এই প্রবণতা পরিহারের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সব শোনা কথা প্রচার ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯২)

ধর্ম কিংবা মনুষ্যত্ব থেকেও যদি চিন্তা করি তাহলে কেন আমরা গুজব ছড়াচ্ছি। রং চা খাওয়ার রেসিপি যখন গ্রামে কিংবা নিরক্ষর মানুষের কাছে চলে যায় তখন মানুষ বিশ্বাস করে। কারণ তাদের কাছে সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের মাধ্যম খুব কম। এছাড়াও আরেকটি কারণ হল, তারা আপনাকে একটু বেশি সচেতন মনে করে। এতে তাদের দোষ নেই। দোষ আপনার আপনি জেনে কিংবা না জেনেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা পাচ্ছেন তাই ছেড়ে দিচ্ছেন। আর সেগুলো গ্রামের সহজসরল কিংবা নিরক্ষর মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। তারাও এটি বিশ্বাস করছেন। সহজসরল মানুষগুলো এসব বিশ্বাস করেনও। কেন বিশ্বাস করেন দুটি ঘটনায় বলি-

ঘটনা ১. আমার বাবার দাদাকে আমাদের বাড়ির একপাশে কবর দেয়া হয়েছে। পরে এটি নিশ্চিত করার স্বার্থে চারদিকে দেয়াল করে দেয়া হয়েছে। একই সাথে কবরের উপরে একটি লাল চাদর টানিয়ে রাখা হয়েছে। আমার এক চাচার ধারণা তিনি পীর ছিলেন। সেজন্য আমার চাচা কবরস্থান মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করেন। আর আমার দাদা প্রতিদিন সন্ধ্যায় কবরস্থানে একটি করে মোমবাতি জ্বালান। কয়েকবছর থেকে আমাদের আশেপাশের গ্রামের মানুষ প্রতিদিনই মোমবাতি, বিস্কুটসহ অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসে। অনেক সময় দেখা যায় কবরস্থানেই দিনে-দুপুরে ২০-২৫ টা মোমবাতি জ্বলছে। কিন্তু কেন জ্বালানো হচ্ছে আমি নিজেও জানি না। তবে গ্রামের মানুষের বিশ্বাস তিনি বড় পীর ছিলেন।

ঘটনা ২. আমাদের পাশের গ্রামের কুশিয়ারা নদীর পাড়ে একটি মাজার আছে। সেখানে প্রতি শুক্রবারে ভক্তরা ভিড় জমান। একদিন ক্রিকেট খেলার জন্য আমরা সেই গ্রামে যাই এবং জুমআর আযানের সময় হয়ে যাওয়ায় আমরা মাজারে চলে যাই। কিন্তু সেখানে নামাজের কোন ব্যবস্থা নেই, নেই কোন পুরুষ মানুষও। শুধু একজন পীর বসে আছেন আর আরেকজন ভক্তদের আনা শিরনী বিতরণ করছেন। এখানে আসা সকল ভক্তই নারী। তবে এখানে খালি হাতে গেলে হয় না। প্রতি শুক্রবার কালো একটি মোরগ নিয়ে যেতে হয়। এভাবে একজন ভক্তকে তিন শুক্রবার যেতে হয়। তবুও মানুষ যাচ্ছে এবং দিনে দিনে ভক্তদের সংখ্যাও বাড়ছে।

এই দুই ঘটনায় বোঝা যায় সহজসরল মানুষ ডাক্তার থেকে পীরবাবাকে বেশি মানে। এজন্য তাদের কাছে গুজব তত্ত্ব গেলেই তারা বিশ্বাস করে। তারা বিশ্বাস করে করোনাভাইরাস আল্লাহর গজব। এখানে আমরা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অথচ এই গজব বা মহামারি আসলে তখন করণীয় কি হবে ইসলামে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

হাদিস শরীফে আছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, কিয়ামতের আগের ছয়টি নিদর্শন গণনা করে রাখো। আমার মৃত্যু, অতঃপর বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়, অতঃপর তোমাদের মধ্যে ঘটবে মহামারি, বকরির পালের মহামারির মতো, সম্পদের প্রাচুর্য, এমনকি এক ব্যক্তিকে একশ’ দিনার দেয়ার পরও সে অসন্তুষ্ট থাকবে। অতঃপর এমন এক ফিতনা আসবে, যা আরবের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করবে। অতঃপর যুদ্ধবিরতির চুক্তি, যা তোমাদের ও বনি আসফার বা রোমকদের মধ্যে সম্পাদিত হবে। অতঃপর তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে এবং ৮০টি পতাকা উড়িয়ে তোমাদের বিপক্ষে আসবে; প্রতিটি পতাকার নিচে থাকবে ১২ হাজার সৈন্য। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১৭৬)

মহামারি প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এটি আল্লাহর গজব বা শাস্তি, বনি ইসরাঈলের এক গোষ্ঠীর ওপর এসেছিল, তার বাকি অংশই হচ্ছে মহামারি। অতএব, কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না। (তিরমিজি শরিফ, হাদিস : ১০৬৫)

সুতরাং আমাদের দায়িত্ব হলো, সমাজে কোনো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তার প্রচার ও প্রসার থেকে বিরত থাকা। বাস্তবতা অনুসন্ধান করে নিজে সতর্ক হওয়া এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে তা অবগত করা। সর্বোপরি নিজের, পরিবারের, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে চেষ্টা করা আমাদের দায়িত্ব।

  • আহমদ ইমরান। গণমাধ্যম কর্মী।
  • ই-মেইল : ahmedemran135@gmail.com
আরও খবর